
অধরাকে ধরার ইচ্ছা, অজানাকে জানার ইচ্ছা। সহজলভ্যকে দূরে ঠেলে দুস্প্রাপ্যকে পাওয়ার ইচ্ছা বহুকাল আগে থেকেই মানুষের মধ্যে আছে। এটাকে ইচ্ছা, স্বভাব যাই বলেন না কেন। আমাদের সবার মাঝেই কম বেশি আছে এটা। আমার মধ্যেও আছে/ছিলো হয়তো ভবিষ্যতেও থাকবে।
ছিল !!... ছিলো, হয়তো এখন আর নেই। অনেক দিন আগে ফেসবুকে একাউন্ট খুলি। সারাদিন নিউজফিডে স্ক্রলিং আর ক্লাসের দু-একজন বন্ধুর ইনবক্সে মেসেজ দিয়েই দিব্বি দিন চলছিলো। কিন্তু এর মাঝে একদিন এক মেয়ের আইডি দেখলাম। তার মধ্যে কিছু অসাধারণ জিনিস ছিল তাই চোখ পরে।
প্রোফাইলের হবির জায়গাটায় দেওয়া ঘুমানোঘুমানো কিভাবে কারো হবি হতে পারে? অন্য কিছু হতে পারে। ঘুমানো তো হতে পারে না৷
মেয়েটার ইনবক্সে জিজ্ঞাসা করি
- "ঘুমানো আপনার হবি?"
সেদিন সে মেসেজের রিপ্লাই দেয় না। ফ্রেন্ডলিস্টেও ছিলো না। ভাবলাম হয়তো সে রিপ্লাই দেবে না। তাই সেদিনের মতো ঘুমিয়ে গেলাম কিন্তু পরদিন বিকেলে যখন ইনবক্স দেখলাম তখন ইনবক্সে তার মেসেজ পেলাম। আমি অবাক হয়ে মেসেজের রিপ্লাই দিলাম। এভাবে শুরু হলো আমাদের কথা।
- ঘুমানো কিভাবে হবি হতে পারে?
- হতে পারে৷ আমার হবি ঘুমানো।
- বেশ আজব তো।
- হুম অনেকটা।
এভাবে চলতে থাকে আমাদের মেসেজিং এবং ধীরে ধীরে আমি তার ব্যাপারে জানতে থাকি। এরপর প্রতিদিন আমি তাকে মেসেজ দেওয়া শুরু করি। রাতে বেশ গল্প গুজব হয় আমাদের। তার সাথে সাধারণ কিছু মেসেজ। "কেমন আছেন?"," কি করছেন?" ইত্যাদি ইত্যাদি...
একদিন রাতে কথা হচ্ছে ... আমি বললাম
- জানেন আমার পদার্থ বিজ্ঞান বইয়ে আমি স্টিকার লাগিয়ে রেখেছি।- পদার্থ!! এর নাম আর নিয়েন না। অপদার্থ একটা।
- স্টিকার লাগানোর কারন জানেন?
- না, কেনো লাগিয়েছেন?
- যেনো পদার্থ লেখা দেখা না যায়।
- ও
বলেই সে কয়েকটা হাসির ইমুজি পাঠালো।আমি তখন আমার স্কুল জীবনের কিছু গল্প তাকে শুনালাম।
-- ক্লাস নাইনে থাকতে একবার আমাদের গণিত শিক্ষক আমাকে ডেকেছেন বোর্ডে অংক করার জন্য। আমি গিয়েছি আর গণিত বই হাতে নিয়ে দুই লাইন লিখে একটু থেমেছি, স্যার হঠাৎ পেছন থেকে জোরে একটা লাথি মেরে আমাকে পাঠিয়ে দিলেন ।
এটা শুনে সে অনেক গুলো ইমুজি পাঠায় হাসির আর নিজের পড়াশোনার ব্যাপারেও কিছু বলে। এরপর হঠাৎ করেই সে নীরব হয়ে যায় ৷ কোনো মেসেজ নাই। কোনো মেসেজ দেখে না। আমি এর মধ্যে আমার আরেক স্যারের কথাও বলি। এরপর আর কোনো মেসেজ নাই।
তখন আনুমানিক রাত ২টা বাজে। আমি "শুভ রাত্রি" লিখে শুয়ে পরি।সকালে উঠে "সুপ্রভাত " পাঠাই। কিন্তু সে রাতের মেসেজি দেখে নাই। এরপর বিকেলে দেখি সে আমাকে ব্লক করেছে ।
মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন আমার । কেন ব্লক দিলো? আমি কি তাকে খারাপ কিছু বলেছি? ব্লক দেওয়ার তো কোনো কারন নাই।
মেসেঞ্জারে ব্লক দিয়েছে সেই রাতেই। মেসেঞ্জার দিয়ে মেসেজ ঠিকি যাচ্ছিলো, যখন ফেসবুক লাইট ওপেন করি তখনি বুঝি যে ব্লক দিয়েছ এরপর অন্য একটা আইডি দিয়ে মেসেজ পাঠালাম।
- ব্লক কেন দিলেন? কারনটা বলে দিন আমি আর মেসেজ দেবো না।
সে দেখল সেটা আর তার রিপ্লাই দিলো
- আমি ইচ্ছা করে দিতে চাইনি। একটা সমস্যা আছে।
আমি বললাম
- কি সমস্যা?
- সে বলল পারিবারিক একটা সমস্যা।
- আমি নীরব রইলাম।
এরপর বললাম
- এখনো কি সমস্যা আছে?
সে কিছুক্ষন দেরি করে আমাকে মেসেজ দিলো।
- না নেই।
তখন সেই আইডি দিয়েই কথা হলো। বেশ কিছুদিন কথা হওয়ার পর আর সেই ব্লকএবারও সে হুট করে ব্লক দিয়েছে। কিছুই বলেনি আগে৷ আমি আবার ভাবলাম। কিন্তু ভেবে কি হবে।
নতুন আইডি খুললাম। আর মেসেজ পাঠিয়ে দিলাম। সেটায় আবার আগের মতোই কথা হচ্ছিলোএকদিন তাকে বললাম
- আমার আইডিটা তো ব্লক করে রেখেছেন। তাই এই নতুন আইডি।
- তো আপনি কি চাচ্ছেন আনব্লক করবো।
- হুম সেটাই চাচ্ছি।
সে আমার আইডি আনব্লক করলো। যেটা আমি সবসময় চালাতাম।আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম তার পরিবারিক সমস্যা হচ্ছে৷এরপর এখন সে আমাকে বললো দেখুন সামনে আমার এসএসসি। আমি কোনোভাবেই চাইনা আমার পরিক্ষার সময় কোনো সমস্যা হোকআমি বললাম
- আচ্ছা ঠিক আছে।
সে এবারে ব্লক দিয়েদিলো। আমি আর তাকে মেসেজ দিলাম না।বেশ কিছুদিন গেলো। আমি একটা পার্টাইম জব করি তখন। সারাদিন কাজ করি।দিন কিভাবে যায় খবর থাকে না৷ এরপর একদিন এসএসসি পরিক্ষা শেষ হলো। ব্যবহারিক বাকি শুধু৷ আমিও দেরি না করে নতুন আইডি দিয়ে তাকে মেসেজ দিলাম।এই আইডি শুধুই তার জন্যে খোলা। অন্য কোনো বন্ধু নাই। ফ্রেন্ড লিস্টে সে ও নাই। মেসেঞ্জারে শুধু সে৷মেসেজ দিলাম
- পরীক্ষা তো শেষ হলো। ব্যবহারিক বাকি।
- আপনি?!
- হুম আমি।
- এখনো মনে আছে আমাকে?
- হ্যাঁ আছে।
- কেমন আছেন?
- ভালো আছি আপনি ভালো আছেন?
- হুম আছি।
এভাবে আবার আগের মতোই কথা শুরু হলো আমাদের।
সে মাঝে মাঝে তার পার্সোনাল কথাও শেয়ার করতো। আরো কতকি। সে গল্পের বই পড়তে অনেক ভালোবাসতো। অনেক সময় বইয়ের ছবি তুলে পাঠাতো । পদ্মা নদীর কাছেই তাদের বাড়ি। কথা হয়েছিলো একদিন সে নদী দেখাবে। সে দূর থেকে ছবি তুলে পাঠিয়েছিলো। এভাবে বেশ ভালোই চলছিলো মেসেজিং । মাঝে মাঝে আমি জিজ্ঞাসা করি সে প্রেম করেছে কিনা, তাকে কেউ প্রপোজ করেছে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি। তাকে অনেকেই প্রপোজ করেছে। কিন্তু সে প্রেম করে নাই। এক সিনিয়র তার ক্রাশ ছিলো কিন্তু সেও অন্য মেয়ের সাথে প্রেম করে৷ এরকমই তার ব্যাপার। প্রপোজ গুলো সামনা সামনি পায়নি। ফেসবুকে মেসেজেই পেয়েছে... সামনাসামনি হলে হয়তো সে হ্যাঁ করে দিতো ।
আমাদের মেসেজিং চলছে। হুট করে একদিন সে বলে বসে ..
- আচ্ছা, অন্য ধর্মের ছেলের সাথে রিলেশনে তো কোনো নিষেধ নাই ধর্মে?
- এই ব্যপারে জানি না। কিন্তু কোথাও পড়েছিলাম বর্ন সংকর করতে নিষেধ করা হয়েছে।
- ও আচ্ছা।
- হু ।
- আমি আর ফেসবুক চালাবো না।
- কেনো?
- ভালো লাগে না। হোয়াটসঅ্যাপ আছে সেখানেই বন্ধুদের সাথে কথা হয়। এই আইডি ডিলিট করে দেবো।
আমি তখন নিরব থাকি। আমি জানি এখন তার নাম্বার চাওয়া আমার ঠিক হবে না তবুও আমি বেশি না ভেবে তার নাম্বার চেয়ে ফেলি ৷
- আপনার নাম্বার দিবেন?
- কেনো?
- আপনি তো আইডি ডিলিট করবেন। আর ফেসবুকে আসবেন না। তাহলে কথা কিভাবে হবে ৷ তাই যদি নাম্বার দিতেন।
আর মনে মনে বলতে থাকি
"please say yes"
কত শতবার যে বলেছি নিজেও জানি না৷ একবার তো তাকে মেসেজেই বলে দেই।
- জানেন এখন আমি কি বলছি মনে মনে?
- না, কি বলছেন?
- please say yes,please say yes,please say yes। কতবার যে বলেছি তার হিসাব নাই৷
- yes
- দেন তাহলে।
- আজ না। কাল দেই?
- আচ্ছা, ঠিক আছে।
পরদিন চাইলাম সে বললো
- আমি আপনাকে ভালো করে চিনি না আর এটা আমার মার মোবাইল এখন আপনাকে নাম্বার দেওয়াটা কেমন জানি।আমি বললাম তাহলে এক কাজ করতে পারেন। মেসেঞ্জারে আসতে পারেন। আইডি ডিএকটিভ করে শুধু মেসেঞ্জার চালাবেন। আর ফোন নাম্বারও আমাকে দিতে হলো না।
সে এতে রাজী হয়ে যায়৷ আর তারপর আমাদের কথা চলেআমি তাকে আমার নাম্বার দিয়ে দেই৷ সে বলে - নাম্বার রইলো। অচেনাই রইলাম৷ আর কোনোদিন অচেনার মতো একবার কল দিলাম।
- হুম তা ঠিক।
সে এরপর বলে আমি যে আপনাকে ব্লক দেওয়ার পর আপনি আমার ফ্রেন্ডদের জিজ্ঞাসা করছেন তার আর করবেন না প্লিজ। সবাই তো আর এক না৷ আমাদের মধ্যে যে কিছু নেই সেটা তারা বুঝবে না আর আমার বাড়িতে বললে আমার অনেক সমস্যায় পরতে হবে।
- আমি এমন করি নাই। একজনকে সুধু মেসেজ দিয়েছিলাম। যখন আপনি আইডি ডিএকটিভ করছিলেন। কিন্তু তিনি মেসেজ দেখেনি নি৷ আর আমি জানি এ ব্যাপারে…. তাইতো এরপর আর এমন কিছু করিনি।
এরপর হঠাৎ করে তার ফেসবুকে আসা কমে যায়। আমি মেসেজ দেই কিন্তু সে তেমন আসে না। এর চার পাঁচদিন পর তার আইডি ডিএকটিভ হয়। আমার ধারনা সে ডিলিটের জন্যে দিয়েছে। আমি অপেক্ষা করতে থাকি কখন সে একটিভ করে। কিন্তু অপেক্ষা করতে করতে পেরিয়ে যায় ত্রিশ দিন। আর এর মধ্যে তার আইডি ডিলিট হয়ে যায়।
পুরোনো মেসেজ বের করে দেখতে থাকি ৷ আইডিতে মাঝে মাঝে পোষ্ট দেই। কিন্তু কার জন্য দেই? আইডিতে তো একটা ফ্রেন্ডও নাই। এখন মেসেঞ্জারে একটা ডিলিট হয়ে যাওয়া কন্টাক্ট আছে শুধু। মাঝে মাঝে তার কিছু আগের লেখা কথা ভালো লাগে - “আপনি এমন সাহিত্যিকের মতো ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা কেনো বলেন?” আমি এর উত্তর দিতে পারিনি। তখন বলার ভাষা ছিলোনা আমার ৷ আর এখন সে নাই।
তার কথা মতো আমি তার খোঁজ নেইনি। শুধু অপেক্ষা করেছি । কখন সে আসবে। কিন্তু কই? সে আসেনি। দিন গেছে মাস গেছে। সে ক্রমেই দুস্প্রাপ্যে পরিনত হয়েছে । তাকে আর খুঁজে পাওয়ার আশা নেই। সে যদি নিজে থেকে ধরা না দেয় তাকে ধরারও কোনো উপায় নেই।
প্রথম মন্তব্য লিখুন
মন্তব্য লেখার জন্য আপনাকে অবশ্যই লগ ইন করতে হবে