
এই গল্পটা আমার না।এটা অন্যদুজনের গল্প। যার শুরু হয়েছিল আমার দ্বারা।
গল্পটার নায়ক আমাদের পাড়ার এক বড় ভাই। নাম রিজু। আমি রিজুদা বলে ডাকি।
কদিন আগে আমাদের পাশের বাড়িতে একটা মেয়ে এসেছিল।এই মেয়েটাই গল্পের নায়িকা।মেয়েটার নাম ঋতু।আমি ঋতুদি বলে ডাকি।ঋতুদি রঞ্জুদের বাসায় এসেছে। রঞ্জু আমার বন্ধু,ও ঋতুদি বলে ডাকে তাই আমিও ঋতুদি বলে ডাকি। ঋতুদি আমাকে আর রঞ্জুকে অনেক আদর করে।
তো কিভাবে জানি ঋতুদিকে রিজুদার ভালো লেগে গেলো!আমি ওসব জানি না।
আমাদের পাড়াতে চালাক ছেলে বলতে আমি আর রঞ্জু।আসলে আমরাই নিজেদেরকে চালাক ভাবি।
এখন রঞ্জুর বোনকে চিরকুট দেবার জন্য তো আর রঞ্জুকে বলতে পারে না।তাই রিজুদা আমাকে ধরলো।শুরু হলো,পুরনো সিনেমার নায়কদের মতো ছোটদের দিয়ে চিরকুট আদান-প্রদান।একে আদান-প্রদান বলা যায় না অবশ্য। কারণ,ঋতুদি আমাকে কোনো চিরকুট দেয়নি রিজুদাকে দেবার জন্য।
আমিও এর সুবিধে উঠিয়ে নিলাম। রিজুদাকে বললাম,চারটে আইসক্রিম দেওয়া লাগবে প্রতিটি চিরকুটের জন্য।দুটা আমার আর দুটা রঞ্জুর। আমরা একজনকে ছাড়া আরেকজন কিছু খাই না—অবশ্য এটা রিজুদাকে বললাম না। কিন্তু রিজুদা আমাকে শর্ত দিয়েছিল যে কেউ যাতে কিচ্ছু টের না পায়,এমনকি আমার প্রিয় বন্ধু রঞ্জুকে পর্যন্ত বলতে না করে দিয়েছিল।এর জন্যেও আমি আরো চারটে মিমি চকলেট চাইলাম।রিজুদা আমার শর্তে রাজি হলো।আমিও রিজুদার শর্তে রাজি হয়ে গেলাম।
প্রথম যে চিরকুটটা আমাকে রিজুদা দিয়েছিল ঋতুদিকে দেবার জন্য সেটা গোলাপি রঙের ছিল।খুব ইচ্ছে ছিল সেটা খুলে দেখার।কিন্তু বড়দের জিনিস দেখা উচিত হবে না—তাই দেখি নি।চিরকুটটা তো ভাঁজ করে দিয়েছিল কিনা।
আমি ভাবতাম যে এই স্মার্টফোনের যোগে রিজুদা চিরকুট নিয়ে খেলাখেলি করতে চাচ্ছে কেন?আবার ভাবতাম আমার কী?আমার তো কোনো লোকসান হচ্ছে না উল্টে লাভ হচ্ছে।
সন্ধ্যেবেলায় রঞ্জুদের বাড়িতে গেলাম। তখন রঞ্জুর মা পুজো দিচ্ছিল।আর ওর বাবা বোধহয় বাজারে ছিল। তখন রঞ্জু অবশ্য ঘরে ছিল। কিন্তু আমি ওর ঘরে না ঢুকে সোজা গিয়ে ঢুকলাম ঋতুদির ঘরে।গিয়ে দেখি ঋতুদি হেডফোন লাগিয়ে গান শুনছে।আমাকে দেখে হাত দিয়ে ঈশারা করে বললো,ঘরে যেতে।আমি ঘরে ঢোকার পর আমাকে ঋতুদি অনেকগুলা কাজুবাদাম দিলো।আমি সবগুলো কাজুবাদাম একসাথে মুখে পুরে দিলাম।
আমি ঋতুদিকে বলতে চাচ্ছি যে এই কাগজটা ধরো।ঋতুদি আমার কথা শুনেছেই না।শুধু ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করছিল,'কি?'
আমি হাত দিয়ে ঈশারা করে বললাম যাতে হেডফোনটা কান থেকে খুলে নেয়। হেডফোন খোলার পর আমি বললাম,'এই ধরো।' আমি চিরকুটটা ঋতুদির দিকে বাড়িয়ে দিলাম।
ঋতুদি জিজ্ঞেস করলো,'কি এটা?'
'জানি না।' আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে বললাম।
'মানে?' ঋতুদি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো।
'মানে একটা লোক আমাকে এটা দিয়েছে তোমাকে দেয়ার জন্য।'
রিজুদা আমাকে কিছু বলতে না করেছিল। তাই আমি কিছু না বলে একটা নিরীহ ছেলের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম।
ঋতুদি আমাকে জিজ্ঞেস করলো,'কে দিয়েছে এটা তোমাকে?'
'চিনি না।'
'এটা তোমাকে দিয়ে তারপর কি বললো?'
'বললো যে এটা তোমাকে যাতে দিয়ে দেই।তোমার নাম বলেছিল।'
'তুমি চিনো কিন্তু বলতেছো না।'
'না,ঋতুদি বিশ্বাস করো।'
তখন ঋতুদি আমাকে একটা ছেলের বর্ণনা দিলো।বর্ণনাটা হুবহু রিজুদার সাথে মিলে গেছে। আমি জানতাম ঋতুদি রিজুদার কথা-ই বলছে। আমাকে জিজ্ঞেস করলো,'এই ছেলেটা কী তোমাকে এটা দিয়েছে?'
আমি বললাম,'না।'
রিজুদা মনে হয় ঋতুদির পিছন পিছন ঘুরেছে কদিন,তাই ঋতুদি বুঝে গেছে যে কে এটা দিতে পারে।ঋতুদি আমাকে আবার জিজ্ঞেস করলো,'তুমি সত্যি কথা বলছো?'
আমি বললাম,'সত্যি ঋতুদি।'
আমার মুখে শয়তানি হাসি ফুটে উঠছিল।কিছুতেই আটকাতে পারছিলাম না। তাই ঋতুদি কিছু বোঝার আগেই আমি রঞ্জুর ঘরে চলে গেলাম।
গিয়ে দেখি রঞ্জু চুপচাপ বসে কী যেন ভাবছে!ওর ভাবনার আর শেষ নেই। আমাকে দেখে ওর মুখটা একশো ভোল্টের লাইটের মতো জ্বলে উঠলো। জোরে বলে উঠলো,'ভাই তোকেই তো খুঁজছিলাম—তোর বাসায় যেতাম এখন।'
ওর হাতের দিকে তাকিয়ে দেখলাম অংক বই।বুঝে গেলাম অংকটা পারছে না,তাই চুপচাপ বসে ভাবছিল।ও বরাবরই অংকে কাঁচা।আমাকেই ওকে বুঝিয়ে দিতে হয় যখন ও না বুঝতে পারে।আর আমি ইংলিশে কাঁচা।ও আমাকে বুঝিয়ে দেই,যখন আমি কিছু বুঝতে না পারি।বন্ধুত্বের মধ্যে এসব চলতেই থাকে।এখন আবার গল্প ফিরে যাই।
রঞ্জুকে বললাম,'রঞ্জু,কতটুকু পরে আমাদের বাসায় চলে আসিস।'
রঞ্জু উল্টো আমাকে কোন প্রশ্ন করেনি।ও আমার কথা অমান্য করে না।
আমাকে আবার রিজুদার কাছে যেতে হবে,রিজুদাকে বলতে হবে—রিজুদার কাজ হয়ে গেছে।
তারপর আমি আমার পাওনাটা নিয়ে চলে আসবো।
রিজুদা আমাকে কথামতো আমার পাওনাটা দিয়ে দিয়েছিল।
আমি আর রঞ্জু মিলে ছোট্ট একটা পার্টি করে ফেললাম।রঞ্জু জিজ্ঞেস করেছিল,'কি উদ্দেশ্যে রে পার্টিটা দিয়েছিস?'
'এমনি।'আমি আর কিছু বললাম না। বন্ধুকে না বলে থাকাটা কষ্টকর।কিন্তু রিজুদাকে যে কথা দিয়েছি!
রঞ্জুও পরেরদিন অনেককিছু নিয়ে আমাদের বাসায় চলে এলো।আরেকটা ছোট্ট পার্টি হয়ে গেলো।ওকে জিজ্ঞেস করায় ও সব বলে দিলো—ও নাকি ঋতুদির হাতে চিরকুটটা দেখে ফেলেছিল।তখন ঋতুদি নাকি রঞ্জুকে আরেকটা চিরকুট দিয়েছিল রিজুদাকে দেওয়ার জন্য।আর রঞ্জুও আমার মতোই ঋতুদির কাছে অনেকগুলো খাবার চায়লো।ঋতুদি রাজি হয়ে গেলো।
রঞ্জু আমাকে সব বলে দিলো,তাই আমিও রঞ্জুকে সব বলে দিলাম।
আমাদের কি?ওদের চিরকুট আদান-প্রদান চলতে থাকবে আর আমাদের পার্টিও চলতে থাকবে।
কিন্তু এরপরে আর কেউই আমাদের দিয়ে কোনো চিরকুট পাঠায়নি।দুটো চিরকুটে-ই ওদের কাজ হয়ে গেছে। চিরকুটে-ই মনে হয়, ওরা সব লিখে দিয়েছিল, তাই আমাদের আর কিছু বলতে না করেছিল। তারা মনে হয় একে অপরকে নিজেদের ফোন নাম্বার দিয়ে
দিয়েছে।
আর আমরা মনে করছিলাম যে ওদের চিরকুট আদান-প্রদান চলতে থাকবে আর আমাদের পার্টিও চলতে থাকবে।
আগে ভাবতাম আমরা অনেক চালাক।এখন দেখি আমরা দুনিয়ার সবচেয়ে বড় বোকা।
তাদের এখন আমাদের কোনো দরকার-ই হয় না।
তাদের যে গল্প আমাদের দ্বারা শুরু হয়েছিল,সেই গল্পে এখন আমাদের কোনো অস্তিত্ব-ই নেই।
প্রথম মন্তব্য লিখুন
মন্তব্য লেখার জন্য আপনাকে অবশ্যই লগ ইন করতে হবে