
আজ সকাল থেকেই আকাশটা কেমন সাজ ধরে আছে। বৃষ্টি হব হব,কিন্তু হচ্ছে না। আমার এমন দিন ভালো লাগে। এমনদিনে আমার কোনো কিছু করতে মন চায় না,শুধু জানলার কাছে বসে গল্পের বই পড়া আর চা খাওয়া এভাবেই পুরো দিনটা কাভার করে দেই।
আজও সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম দিনটা এমন—তাই আজ আর কোনো কিছু করবো না শুধু গল্পের বই পড়বো–আমি কোনোসময়-ই সকালে নিউজপেপার পড়ে দিন শুরু করি না কারণ,নিউজপেপারে খুনাখুনি-হানাহানি বিভিন্ন মন খারাপ করা নিউজ থাকে আর আমি মন খারাপ দিয়ে দিনটা শুরু করতে চাই না।
এক হাতে বই আরেক হাতে চায়ের কাপ নিয়ে বসলাম গিয়ে জানলার কাছে। আকাশের দিকে তাকালাম—কি সুন্দর লাগছে আজ আকাশটা!
চায়ের কাপে চুমুক দিতেই আমার সেদিনটার কথা মনে পড়ে গেল।সেদিনও আকাশটা এমন ছিল—বৃষ্টি হব হব, কিন্তু হচ্ছিল না।
সেদিন আমার মাধ্যমিকের শেষ পরীক্ষা ছিল। মনটা খুব ভালো ছিল, শেষ পরীক্ষা ছিল তো।তারপর কয়েকদিন আর পড়ালেখার কোনো চাপ নেই। নিশ্চিন্তে ঘুরতে পারবো কদিন।
সেদিন দিনটা মেঘলা মেঘলা ছিল, তাই বাবা বললো ছাতাটা নিয়ে যেতে। আমি নিলাম না,ছাতা নিলে আমার হাতে আলাদা একটা ভোঝা লাগে। কিন্তু মা বলার পরে না নিয়ে পারলাম না। মার কথা না মানা আমার সাধ্য না,আমি বাবার চেয়েও মাকে বেশি ভয় পাই।
মনে করেছিলাম ছাতাটা শুধু শুধু এনেছি বৃষ্টি তো হবেই না।কিন্তু না,আমি ভুল।বৃষ্টি হঠাৎ শুরু হয়ে গেল। ভালোই হলো ছাতাটা এনে,বৃষ্টিতে ভিজতে হলো না। ভিজলে আর পরীক্ষা দিতে হতো না।
সেদিন বৃষ্টিতে ওকে প্রথমবার দেখেছিলাম। ওর হাতে ছাতা ছিল না, কোথায় যেন দৌড়ে যাচ্ছিল।আমার মনে হলো ছাতাটা নিয়ে ওকে দেই।কিন্তু একটা অচেনা মেয়েকে হঠাৎ করে গিয়ে ছতাটা দেওয়া ঠিক হবে?আবার আমিও তো ভিজে যাবো!এইসব ভেবে আর ছাতাটা-ই দেওয়া হলো না।
আমি স্কুলের গেট দিয়ে ঢুকলাম, ওকেও দেখলাম এই গেট দিয়ে-ই স্কুলে ঢুকলো।ও কি আমাদের স্কুলে পড়ে নাকি?আমি তো ওকে চিনি না!চিনবো কি করে,আমি শুধু স্কুলে আসতাম আর যেতাম।স্কুলে আসতাম-ই কদিন বেশিরভাগই তো আসতাম না।
আমার বন্ধু যারা—রন্ঞ্জু,তিথি,রিজু,আদি,মিমকে ছাড়া তো আর কাউকেই চিনি না। চিনি না বললে হয়তো কিছুটা ভুল হবে,চিনি কিন্তু নাম জানি না। কিন্তু বেশিরভাগকে আসলেই চিনি না।
সিক্স থেকে পড়লে হয়তো চিনতাম। সে হয়তো নাইনে ভর্তি হয়েছিল।
ও আমাদের সাথেই পরীক্ষা দিবে—ওর হাতে পরীক্ষার সরঞ্জাম দেখলাম।আমি ওর কাছে গিয়ে নম্রভাবে জিজ্ঞেস করলাম,'অ্যাডমিট কার্ড ভিজে গেছে নাকি?'
ও আমার দিকে অবাক হয়ে ফিরে তাকালো। হয়তো অবাক হওয়ার কারণটা আমি জানি।আসলে আমি স্কুলের কারও সাথে বেশি কথা বলি না,আর
মেয়েদের সাথে তো একেবারে না,শুধু আমার বন্ধুরা ছাড়া।
'ও..চ্যাম্পিয়ন!' ও বললো,'না আমি কোনোরকমে
এটাকে বাঁচালাম।'
চ্যাম্পিয়ন বললো কারণ,আমি স্কুলে না আসলেও মাঝে মাঝেই অলিম্পিয়াড দিতাম আর ফার্স্টও হতাম।মাঝে মাঝে না সব অলিম্পিয়াডই দিতাম আসলে।তাই হয়তো……
আমি স্কুলে কম আসতাম কারণ, স্কুলে স্যার-ম্যামরা পড়া নিতো মুখস্থ বিশেষ করে বিজ্ঞান—ভালো ব্যাখ্যা দিলেও তাদের হতো না,তাদের চায় মুখস্থ। তাই ভালো লাগতো না স্কুলে আসতে। বাসাতে-ই নিজের মতো করে পড়তাম।
আমি সামান্য লজ্জ্বা পেলাম—চ্যাম্পিয়ন বলাতে।
'তুমি তো ভিজে গেলে।' আমি বললাম।
'না-এইটুকু ভিজলে কিচ্ছু হবে না।' ও বললো।
আসলে ও বেশি ভিজলো না।বৃষ্টি শুরু হয়েছে আমাদের স্কুল গেটের একটু দূর থেকে।ওইটুকু জায়গা থেকে ভিজলে কিছু হবে না।আমার বাড়িয়ে কথা বলার অভ্যাস আছে আর কি।
'আমি নিলি,তুমি হয়তো আমাকে চিনো না।' ও বললো।
'না আসলে..' আমি বললাম,'আমি নীল।'
'তোমাকে চিনি।'
'ও...তুমি কোন সেকশনে?'
'তুমি যে সেকশনে।'
আর আমি ওকে আগে দেখি নি—আমি যে কি!
'আগের পরীক্ষাগুলো কেমন হলো?'আমি জিজ্ঞেস করলাম।
'ভালোই,তোমার?'
'ভালোই।'
বেল বেজে উঠলো।হলে গিয়ে বসলাম—নিলি
আমার মাত্র পাঁচ বেঞ্চ পেছনে,আমি এতদিন লক্ষ্য করিনি।
পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে আমি ওকে–'অল দ্যা বেস্ট।'বললাম,যা এর আগে আমি আর কাউকে বলিনি।নিলিও আমাকে বললো।
পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর আমি আগে হল থেকে বেরিয়ে শুধু আমার বন্ধুদের সাথে দেখা করতাম,আজ নিলির সাথেও করলাম।
মিম নিলিকে জিজ্ঞেস করলো,'নিলি,পরীক্ষা কেমন হলো?'
'ভালো রে।' নিলি বললো,'তোদের কেমন হলো?'
আমার বন্ধুরাও ওকে চিনে।আর আমি…
যাই হোক, সবাই বললো,'ভালো।'
একমাত্র মিম ছাড়া।মিম মেয়েটা একটু আপোস করা টাইপের। তাই ওর সাথে কেউ বেশি তর্ক করে না।
মিম বলে উঠলো,'না রে,আমি মাত্র তিরানব্বই আনসার করলাম।'
'সমস্যা কিসের?ভালোই তো করলি।' নিলি বললো।
নিলি আলাদা আবার আমাকে জিজ্ঞেস করলো—
'কেমন হলো,নীল?'
'বরাবরের মতোই।'আমি বললাম।
'তার মানে ভালো।'
'তোমার যা ইচ্ছে মনে করতে পারো।'
'আমি মনে করি ভালোই।'
'তোমার ইচ্ছে।'
'আমার মনে হয় আমাদের একে অপরকে তুই বলে ডাকা উচিত—আমরা এক বয়সী তো,তাহলে আমাদের বন্ধুত্বটা আরো গভীর হবে–আমরা বন্ধু তো?'
'হ্যা অবশ্যই।'
'তাহলে,ডান।আজ থেকে একে অপরকে তুই বলে ডাকবো, ওকে?'
'ওকে।'
আমার সবসময় পরীক্ষা শেষ হওয়ার তাড়া থাকতো।সেদিন কেন জানি আমার পরীক্ষা শেষ হলেও ভালো লাগছিল না।
বাড়িতে যাওয়ার সময় আমি নিলিকে বললাম—
'নিলি,তুমি আমার সাথে যেতে পারো–তোমাকে বাসায় দিয়ে আসবো,কোনসময় আবার হঠাৎ বৃষ্টি নামে বলা যায় না-ভিজে যেতে পারো।আমার কাছে ছাতা আছে তাই বলছিলাম…..'
'চল তাহলে,তোকে বললাম না তুই করে ডাকতে!'
'ও সরি,সরি–চল।'
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে নিলিকে জিজ্ঞেস করলাম, 'তো নিলি কোথায় ঘুরতে যাবি তাহলে?
'আমার ঘুরাঘুরি ভাল্লাগে না,' নিলি বললো,'তুই কোথায় যাবি?'
আমার ঘুরাঘুরি অত্যন্ত ভাল্লাগে,তাও আমি বললাম,'আমারও সেম।'
'তাহলে তো আমরা মাঝে মাঝে আড্ডা দিতে পারবো বল?'
'হ্যা,তা পারবো।'
'আমাদের ব্যাচে আর কী কেউ আছে, যাদের ঘুরাঘুরি ভাল্লাগে না?'
'না—আমাদের ব্যাচের প্রায় সবাই-ই ঘুরতে পছন্দ করে।'
'তাহলে আমরা দুজন মিলেই আড্ডা দিবো।'
'ওকে।'
প্রথম দেখাতেই আমার আর নিলির মধ্যে একটা ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। আমি এর আগে কখনো কোনো মেয়ের সাথে এত কথা বলিনি।এমনকি আমার বন্ধু মিম আর তিথির সাথেও না।
আমি আর নিলি মাঝে-মধ্যেই আড্ডা দিতাম।কখনো ওর বাসায় কখনো আমার বাসায়। আমাদের সাথে রিজু আর আদিও মাঝে মাঝে আড্ডা দিতো।আমি আর নিলি কখনো হাঁটতেও যেতাম। নিলির সাথে সময় কাটাতে আমার ভালো লাগতো।
আমি আর নিলি একই কলেজে অ্যাডমিশন নিলাম।আমাদের ব্যাচের শুধু নিলি-ই আমার সাথে এই কলেজে অ্যাডমিশন নিয়েছিল।
আমি আর নিলি একসাথে-ই কলেজে যেতাম।
আমি কোনোসময় কবিতা লিখি নি,আসলে কবিতা আমার ভালো লাগতো না।
কিন্তু নিলিকে দেখার পর আমি প্রথমবার একটা কবিতা লিখেছিলাম।আমি লিখি নি—আমার মন থেকে আপনা-আপনি ছন্দ মিলে গেছে।
আমি নিলিকেও এই কবিতাটা শুনিয়েছিলাম। কবিতাটা ছিল—
প্রথমবার যখন দেখেছিলাম তোমায়
কতগুলো অনূভুতি জমেছে
মনের কোনো এক কোণায়
হাঁটতে যাওয়ার উঁচিলায়
আমি দেখতে যাই তোমায়
কোনদিন জানি আমি
বলতে পারবো তোমায়
সঙ্গী হবে আমার
জীবনের পথচলায়
খুব ভালোবেসে ফেলেছি তোমায়
কিন্তু তুমি কী মেনে নেবে আমায়
এই কবিতাটা শোনার পর নিলি আমাকে কমপ্লিমেন্টও দিয়েছিলো—'বাহ, নীল তুই এত ভালো কবিতা লিখিস আমাকে তো আগে কখনো শোনাসনি?'
আমি এমন ভাব করেছিলাম যেন আমি এক মহান কবি—'এই আর কি!'
'কেমন হয়েছে?' আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম।
'দারুণ হয়েছে, অসংখ্য ভালো হয়েছে।'
আমি আর ওকে বলতে পারলাম না যে,এই কবিতাটা ওর জন্যে-ই লেখা।
আমার এর আগে আর কখনো কোনো মেয়েকে এত ভালো লাগেনি।
আমি নিলিকে বোধহয় ভালোবেসে ফেলেছিলাম। কিন্তু কখনো ওকে বলা হয়নি।আসলে বলতে পারলাম না। যদি আমাদের বন্ধুত্ব ভেঙে যায়—এই ভয়ে বলতে পারলাম না।
আমার নিলির আগে আর কাউকে ভালো লাগেনি আর নিলির পরেও কাউকে ভালো লাগেনি।
নিলি মেয়েটা খুব ভালো—সবসময় ওর মুখে একটা হাসি লেগে থাকতো।আমি ওকে কোনোসময় মন খারাপ করতে দেখি নি।
হয়তো ওর মুখের হাসিটা চলে যাবে, ও মন খারাপ করে ফেলবে—এই ভয়ে বলতে পারি নি।
আমি আসলেই নিলিকে খুব ভালোবেসে ফেলেছিলাম।যদি সেদিন একটু সাহস করে বলতে পারতাম,আজ হয়তো…….
আজ,৮ বছর পর ওর কথা আমার মনে পড়লো।আসলে সবার কাজে সবাই ব্যস্ত,কেউ কারও খোঁজ-খবর নিতে পারে না।
আমার মনটা কেমন-কেমন করছে। যদি আমি নিলিকে একটু সাহস করে বলতে পারতাম—হয়তো নিলি আজ আমার সাথে বসে একসাথে চা খেতো,গল্প করতো,বৃষ্টি দেখতো।
প্রথম মন্তব্য লিখুন
মন্তব্য লেখার জন্য আপনাকে অবশ্যই লগ ইন করতে হবে