হ্যাবলা


হ্যাবলা

গ্রামের নাম পলাশপুর।গ্রামটি এত সুন্দর যে,মনে হয় একজন চিত্রশিল্পী খুব মনোযোগ দিয়ে ছবিটি এঁকেছে।গ্রামটি বেশি বড় না,কিন্তু এই ছোট্ট গ্রামটি-ই অনেক সুন্দর। এই ছোট্ট গ্রামটিতে-ই থাকে হ্যাবলা—নামটি খুবই অদ্ভুত!হ্যাবলা একটা ছেলের নাম–যার আসল নাম শায়ন,কিন্তু গ্রামের কেউ-ই ওকে শায়ন বলে ডাকে না—সবাই ওকে হ্যাবলা বলে ডাকে। 


 

একদিন শায়ন কোথাও একটা যাচ্ছিলো।তখন পিছন থেকে কেউ একজন ওকে বার বার ডাকছিলো।কিন্তু শায়ন খেয়াল করেনি,ও একমনে হাঁটছিলো।হঠাৎ ও খেয়াল করলো,কেউ যেন ওকে পিছন থেকে ডাকছে। ঠিক তখনই লোকটা মজা করে বললো,'ওই হ্যাবলা, কানে শুনস না নাকি?'—আর শায়নও পিছনে তাকালো।তখন থেকে লোকটা শায়নকে আর নাম ধরে ডাকে না,হ্যাবলা বলে ডাকে।লোকটা শায়নকে হ্যাবলা বলে ডাকে–তা দেখে গ্রামের আরো কজন ওকে হ্যাবলা বলে ডাকতে শুরু করে।

আর শায়নও রেগে যায়,তাকে হ্যাবলা বলে ডাকলে।মানুষ শায়নকে আরো বেশি রাগানোর জন্য হ্যাবলা বলে ভ্যাংছি কাটে।ধীরে ধীরে প্রায় গ্রামের সবাই ওকে হ্যাবলা বলে ডাকতে শুরু করে দেয়—যেন ওর আসল নাম-ই হ্যাবলা!


 

ও যদি কারো সামনে দিয়ে যায়—তাহলে কারও যদি ওকে দিয়ে কোনো কাজ করানো হয় বা এমনি-ই ডাকে তখনও হ্যাবলা বলেই ডাকে।শায়ন থেকে ওর নাম পড়ে গেছে হ্যাবলা।


 

একদিন বিকেলবেলা শায়ন মাঠে খেলতে যাচ্ছিলো।তখন গজানন শায়নকে বলে উঠলো,'কিরে,হ্যাবলা কই যাইতাছস?'

শায়ন এসে তখন গজাননকে বললো,'তোমরা সবাই আমাকে হ্যাবলা বলে ডাকো কেন?আমার তো সুন্দর একটা নাম আছে–শায়ন,ওই নামে ডাকো না কেন?'

গজানন টিটকারি মেরে বললো,'তুই ব্যাবলা,তাই তোকে বলি হ্যাবলা!'

শায়ন মুখটা গম্ভীর করে বলে উঠলো,'আমি ব্যাবলা হলে ব্যাবলা-ই ঠিক আছি–নিজের জায়গায়।তোমার মতো সারাদিন একটা ঢিলেঢালা শার্ট পড়ে,একটা লুঙ্গি পড়ে,মাথায় একটা লাল কাপড় বেঁধে–চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিই না,গোণ্ডাগিরি করি না।'


 

গজানন রেগে এসে শায়নকে থাপ্পড় দিতে গেল,সেইসময় চায়ের দোকানের কৃষ্ণদা বললো,'আরে গজা ভাই ছাইড়া দেও ছোড বাচ্চা।'

সেই ফাঁকে শায়ন দৌড়ে বাড়ি চলে গেলো।গজানন পিছন ফিরে দেখে শায়ন ওখানে নেই। 

বাড়ি গিয়ে শায়ন রান্নাঘরে ওর মার কাছে গিয়ে বসে ওর মাকে বলতে লাগলো,'মা,সবাই আমাকে হ্যাবলা বলে ডাকে কেন?আমার খুব রাগ হয়।'

তখন শায়নকে ওর মা বোঝাতে লাগলো,'দ্যাখো বাবা,কেউ যদি তোমাকে রাগানোর জন্য কিছু বলে,তখন তুমি না শোনার ভান করে চলে আসবে।তুমি যদি তখন রেগে যাও—তখন লোকে তোমাকে রাগানোর জন্য আরো বেশি করে 'হ্যাবলা' বলে ডাকবে।বুঝেছো হ্যাবলা!'

এই কথা বলে ওর মা মুচকি হাসতে হাসতে ওর চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বললেন,'আমার সোনা ছেলে।'

তখন শায়ন একটু রাগ রাগ মুখ করে বললো,'মা তুমিও আমাকে হ্যাবলা বলে ডাকলে!'

মা বললেন,'এই দ্যাখো,ছেলেকে এতক্ষণ কী বোঝালাম—বললাম না কেউ যদি তোমাকে রাগানোর জন্য কিছু বলে তখন রাগতে নেই,চুপচাপ না শোনার ভান করে চলে আসবে।'

শায়ন তখন ওর মাকে বললো,'তাহলে যদি কেউ আমাকে মারে–তখনও কি আমি চুপচাপ….'

মা একটু রাগ করে বললেন,'বাবা তোমাকে বোঝানো আমার সাধ্য না,তোমাকে বোঝানোই শুধু শুধু।বাংলা একটা প্রবাদ আছে—"আমি বলি কি আর আমার সারিন্দা বলে কি।"তোমার ক্ষেত্রে প্রবাদটা একদম ঠিক।তোমার যা ইচ্ছে করো গিয়ে।'


 

শায়ন মুখটা গম্ভীর করে সেখান থেকে চলে গেলো। 

শায়ন এখন স্কুলেও যেতে চায় না,ওর স্কুলের বন্ধুরাও ওকে হ্যাবলা বলে ডাকে।

গ্রামের সবাইও ওকে হ্যাবলা বলেই ডাকতে শুরু করে।শায়নও এই বিষয়টা নিয়ে বেশিই মাথা ঘামায়।


 

এভাবে চলতে থাকলে ধীরে ধীরে শায়ন একটু কেমন জানি হয়ে গেলো।ও এখন ঘর থেকেই বের হতে চায় না।আর যদিও বের হয়–তখন ও হাতে একটা লাঠি নিয়ে বের হয়।কেউ যদি ওকে হ্যাবলা বলে ভ্যাংছি কাটে তখন ও লাঠি নিয়ে দৌড়ানি দেয়।আর মানুষও কেন জানি ওকে রাগানোর জন্য আরো বেশি করে এসব করে!


 

এখন শায়নকে আর ঘরে রাখা যায় না। ও একটা লাঠি নিয়ে ওর  মাকে বলে,'দেখি কে আমাকে হ্যাবলা বলে ডাকে–পিটিয়ে ওর পিটের ছাল তুলে নেব!'এই কথা বলে ঘর থেকে দৌড়ে বের হয়ে যায়। 

শায়নের বাবা যদি বেঁচে থাকতো তাহলে ছেলেকে সামলাতে পারতেন,ওর মা একা সবকিছু সামলাতে হিমশিম খান–শায়নেরও অত খেয়াল রাখতে পারেন না।


 

আজকাল শায়ন পাগলের মতো হয়ে গেছে।ওর ভ্রম হয়—ও যেখানেই যায় ও দেখে ওকে কেউ হ্যাবলা বলে ভ্যাংছি কাটছে। অথচ ওখানে কেউ না থাকলেও ও এসব-ই দেখে!তখন ও লাঠি নিয়ে দৌড়ানি দেয়। 


 

সেদিন সন্ধ্যার সময় ও পুকুরের ধার দিয়ে বাড়ি ফিরছিল–হঠাৎ ও দেখে পুকুরে কতগুলো ছেলেমেয়ে স্নান করছে আর ওকে দেখে হ্যাবলা বলে ভ্যাংছি কাটছে।শায়ন তখন ওকে দৌড়ানি দিতে গিয়ে কাঁদায় পা পিছলিয়ে পড়ে গেলো পুকুরে। অথচ সেদিন কেউ ছিল না পুকুরে–সন্ধ্যার সময় কোন ছেলেমেয়ে স্নান করবে পুকুরে!

শায়ন সাতার জানতো না।ও অনেক্ষণ পানিতে হাবুডুবু খেলো,সন্ধ্যার সময় কেউ ছিলও না পুকুরের ধারে কাছে।


 

সন্ধ্যা হলেও শায়ন ঘরে না ফিরলে ওর মা ওকে সারাগ্রামে খোঁজলেন—অনেককে জিজ্ঞেস করলেন কিন্তু সবাই বললো,কেউ শায়নকে বাড়ি ফিরতে দেখে নি।

আবার অনেকে বললো,ওরা নাকি শায়নকে পুকুরধার দিয়ে বাড়ি ফিরতে দেখেছে।কিন্তু শায়ন তো বাড়ি ফিরলো না। 

ওর মা কেঁদে কেঁদে অস্থির। 



 


রিদা
Sandeep Roy
Nipendra Biswas
তারা এই গল্পটি পছন্দ করেছেন ।

২টি মন্তব্য

রিদা

রিদা

৩ বছর আগে

মানুষকে এমন কোনে নামে ডাকা উচিত না যেই নাম শুনে সে পছন্দ করে না শুনে কষ্ট পায়!! আদুরে নাম ঠিকাছে, কিন্তু কেউ কষ্ট পাবে এমন কোনো নামে কাউকে ডাকা উচিত না!!

Nipendra Biswas

Nipendra Biswas

৩ বছর আগে

শিক্ষণীয়🙂


মন্তব্য লেখার জন্য আপনাকে অবশ্যই লগ ইন করতে হবে


আপনার জন্য

নীল দ্বীপ (পর্ব২)

নীল দ্বীপ (পর্ব২)

ব্রেকফাস্ট শেষে মৃন্ময় ত...

কে তুমি

কে তুমি

                     "কে...

ধাপ্পাবাজ বাপ্পা অথবা ধাপ্পাদা

ধাপ্পাবাজ বাপ্পা অথবা ধাপ্পাদা

—বাপ্পাদার নাম যেভাবে ধা...

তুমি অন্যনা (শেষ পর্ব)

তুমি অন্যনা (শেষ পর্ব)

রনি সেখানে যেয়ে ইসরাতকে ...

খাঁটি পাগল

খাঁটি পাগল

বিধূবাবুর কাছে এক পাগল এ...

আমি

আমি

              আমি       ...

নীল দ্বীপ (শেষ পর্ব)

নীল দ্বীপ (শেষ পর্ব)

মৃন্ময়ের বিয়ের সবকিছু ঠি...

প্রিয় জয়ন্ত স্যার

প্রিয় জয়ন্ত স্যার

তখন সবে হাইস্কুলে উঠেছি।...

কে ছিল???

কে ছিল???

আমি আগে ৯ -১০ টার মধ্যেই...

বন্ধু

বন্ধু

রিজু,আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।...

নিদ্রাহীন

নিদ্রাহীন

রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে...

হাস্যকর এক কাণ্ড

হাস্যকর এক কাণ্ড

কয়েকদিন আগের কথা। আমি যে...

হ্যাবলা

হ্যাবলা

গ্রামের নাম পলাশপুর।গ্রা...

পরীক্ষার পূর্বদিন

পরীক্ষার পূর্বদিন

সারাবছর ভালো করে পড়েনি প...

অ্যাক্সিডেন্ট

অ্যাক্সিডেন্ট

অ্যাক্সিডেন্ট আজ আমি ভীষ...

লায়লা

লায়লা

"তুমি ছুয়ে দিলে হায়, কিয...

নীল দ্বীপ (পর্ব৩)

নীল দ্বীপ (পর্ব৩)

নীল দ্বীপ পর্ব ৩ মৃন্ময় ...

সেদিন

সেদিন

 আজ সকাল থেকেই আকাশটা কে...

নীল দ্বীপ

নীল দ্বীপ

           লেখক :ইসরাত ই...

ছোটগল্প

ছোটগল্প

আমি গল্প লিখি। তবে লেখক ...