যখন সন্ধ্যা নামে


যখন সন্ধ্যা নামে

প্রতিদিন যখন সন্ধ্যা নামে আমি আর ত্রিধা এই নদীর পাড়ে এসে বসে থাকতাম।এই সময় আকাশটা খুবই সুন্দর লাগে।সূর্য যখন অস্ত যায় —তখন আকাশের রঙটা অন্যরকম হয়ে যায়। 

আজ আমার পাশে ত্রিধা বসে নেই। কিছু করার নেই আমার —সবই নিয়তি।কিন্তু অনেক সময় আমার মনে হয় হয়তো ত্রিধা আজ বেঁচে থাকতো।


আমাদের পাড়ার দূর্গো পূজোতে ওকে প্রথম দেখেছিলাম।পূজোর মণ্ডপে যখন আসতো,চোখের এক কোণ দিয়ে ওর দিকে চেয়ে থাকতাম।পুরোপুরি ভাবে চেয়ে থাকতে পারতাম না—কেউ যদি দেখে ফেলে–যে আমি ওকে দেখছি —খুবই বিচ্ছিরি কাণ্ড হয়ে যাবে!এটা তো কোনো ফিল্ম না,যে ওর দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে অনেকসময় চেয়ে থাকলেও কেউ কিচ্ছু দেখবে না!এটা সত্যিকারের জীবন। 


আমার পুজোর মণ্ডপে গিয়ে বসে থাকতে তেমন ভালো লাগতো না—কিন্তু আমি গিয়ে বসে থাকতাম শুধু ওকে দেখার জন্যে।

খোঁজ-খবর নিয়ে দেখলাম,এখানে ওর মামার বাড়ি।

এভাবে নবমী পর্যন্ত চলল।দশমীতে আমি আর থাকতে পারলাম না। একবার মনে হয়, ফিল্মি স্টাইলে গিয়ে বলি,'তোমাকে আমার খুব ভালো লাগে' আবার ভয়ও হতো -–আগেই বলেছি,এটা ফিল্ম না সত্যিকারের জীবন। চড়-থাপ্পড় মেরে বসলে মানসম্মান ছাড়খার!

কিন্তু না বলে পারলামও না,ওকে আসলেই আমার খুব ভালো লেগেছিল। 

দশমীতে সিঁদুর খেলার সময় ওকে খুব ভালো লাগছিল।ও সেদিন শাড়ি পড়েছিল।কপালে ছোট্ট একটা লাল টিপ।পায়ে পায়েল,আলতা।গালে সিঁদুর লেগে রয়েছিল।সবমিলিয়ে খুব সুন্দর লাগছিল ওকে।

মূর্তি বিসর্জনের পরে সবাই বাসায় ফিরছিল।ত্রিধা 

আর মৌমিতাকেও দেখলাম বাসায় ফিরছে।ওদের বাসার মৌমিতা ছাড়া আর কেউ ছিল না ত্রিধার সাথে।মৌমিতা ত্রিধার মামাতো বোন।ওকে আমি চিনি।

আমার মনে হয়েছিল মা দূর্গাই বুঝি আমার জন্য এই সময়টা করে দিয়েছেন। আমি দূগ্গা-দূগ্গা মনে মনে বলতে বলতে, পেছন থেকে ডাক দিলাম,'এই যে ত্রিধা?'—ওরা পিছনে ফিরে তাকালো,ওদের চেহারায় অস্পষ্টতা ফুটে উঠেছে।

ওরা নিশ্চয়ই ভাবছিল,আমি নাম জানলাম কী করে!

আমি ওদের কাছে গিয়ে বললাম,'সরি,আপনাদেরকে বিরক্ত করার জন্য,আসলে আপনাকে একটা কথা বলতে চাচ্ছিলাম। '

ত্রিধা কিচ্ছু বলল না।কিন্তু মৌমিতা একটু কৌতূহল দেখালো।মৌমিতা আমাকে বলল,'কি বলতে চাও আর তুমি ওর নাম জানলে কি করে?'

'সব বলবো একটু পরে, তুই একটু দূরে যাবি প্লিয?আমি ওনাকে একটা কথা বলতে চাচ্ছিলাম।'

'তুমি আমার সামনে বলো।'

ত্রিধাও বললো,'মৌমিতা এখানেই থাকুক,আপনি কি বলবেন বলুন প্লিয, আমাদেরকে বাসায় ফিরতে হবে।'


আমি কি করে বলবো,বুঝতে পারছিলাম না।আমি একটা বড় নিশ্বাস নিয়ে, সাহস করে  আমতা-আমতা করে বলতে লাগলাম,'আ-আ-আসলে আপনাকে আমার খুব ভালো লাগে।'অবশেষে বলেই ফেললাম! 

আমি ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম,আমার বুক ধপ্-ধপ্ করছিল।মৌমিতা আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল।

আমার মনে হচ্ছিল এখনই বুঝি আমার গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিবে—তবুও আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম। ত্রিধা কোনো উত্তর দিলো না,মুখ ফিরিয়ে চলে যেতে লাগলো। 

আমি মৌমিতাকে ডাক দিয়ে বললাম,'মৌমিতা সরি,আর ওনাকেও বলে দিস।আর এখানের কথা কাউকে কিছু বলিস না প্লিয বোন।'

—'ঠিক আছে'

—'থ্যাঙ্কস'


আমি সেদিন খুব অস্বস্তি বোধ করছিলাম।আমার কথাটা বলা বোধহয় ঠিক হয়নি।আমি ওকে সরি বলব সামনাসামনি ঠিক করেছিলাম। ওর সামনে যেতেও আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। 

পরেরদিন বিকেলে ত্রিধা যখন আমাদের এইদিকে হাঁটতে এসেছিল,ওর সাথে মৌমিতাও ছিল।

আমি জানলা দিয়ে ওকে দেখতেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম—উদ্দেশ্য ছিল ওকে সরি বলব। ত্রিধা আর মৌমিতা দূর্গা মন্দিরের পুকুরঘাটের সিঁড়িতে বসে ছিল,আমিও ওখানে গেলাম—

'এই যে শুনুন?'

ওরা পেছন দিকে তাকালো।

'সরি,আপনাদের আবার বিরক্ত করলাম।'

মৌমিতা বলল,'এখন আবার তুমি কি বলতে চাও?'

'না আসলে সেদিনের জন্য আমি খুব দুঃখিত–সরি,ইফ ইউ কেন প্লিয…..' ত্রিধাকে উদ্দেশ্য করে বললাম। 

'না না,ইট'স ওকে' ত্রিধা আমার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বললো।

'থ্যাঙ্কস, আপনাকে আমার আসলেই খুব ভালো লাগে, ও...আবার সরি'

'ভালো লাগতেই পারে,ও কিছু না'

আমি কিছু  বললাম না। ত্রিধা-ই আবার বললো,'এখন বলুন,আপনাদের এখানে ঘুরতে যাওয়ার কোনো জায়গা আছে কি?'

মৌমিতা ত্রিধাকে বলল,'দিভাই আমাকেই তো বলতে পারিস?'

আমার তখন একটু রাগ হয়েছিল মৌমিতার ওপর। 

ত্রিধা বলল,'না ওনাকে বলতে দে।'

আমি বললাম,'ঘুরতে যাওয়ার জায়গা তেমন নেই,আপনি যদি চান আপনাকে একটা নদীর ধারে নিয়ে যেতে পারি। যখন সন্ধ্যা নামে ওখানের দৃশ্য অত্যন্ত দারুণ লাগে।—অন্তত আমার কাছে।'

'চলুন তাহলে যাই,চল মৌমিতা।'এই বলে তারা উঠে দাঁড়ালো।


নদীর ধারে হালকা বাতাস বইছিল,খুব ভালো লাগছিল। কানে আসছিল পাখির ডাক।কোনো কোলাহল ছিল না।শুধু ছিল পাখির ডাক,বাতাসের শব্দ, নদীর স্রোতের কলকলানি,ছিল অর্ধেক ডুবে যাওয়া সূর্য,ছিল হলুদ-কমলা-নীল ইত্যাদি রং মিশ্রিত অপূর্ব সুন্দর আকাশমণ্ডল আর ছিলাম শুধু আমরা তিনজন—আমি,ত্রিধা আর মৌমিতা।

বাতাসে ত্রিধার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল।তখন ওকে যে কি সুন্দর লাগছিল!আমি চোখ সরাতে পারছিলাম না।ও চুলগুলো সামলে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে ঈশারা করলো।আমি মাথা নাড়লাম। 

নদীর পাড়ে বসে সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো,'আমাকে তোমার কেন ভালো লাগলো?'

'আমি জানি না,তোমাকে অ… সরি আপনাকে..'

ও আমার কথা থামিয়ে আমাকে বললো,'তুমি করেই বলতে পারো।'

আমি তখন লক্ষ্য করেছিলাম ত্রিধাও আমাকে তুমি বললো।আমি কোনো রিয়েকশন না দিয়ে বলতে লাগলাম, 'আসলে তোমাকে যেদিন প্রথম দেখেছিলাম আমার খুব ভালো লেগেছিল, বিশ্বাস করো এর আগে আর কোনো মেয়েকে আমার এত ভালো লাগেনি।আমার পুজোর মণ্ডপে গিয়ে বসে থাকতে ভালো লাগতো না, কিন্তু আমি তোমাকে দেখার জন্য মণ্ডপে গিয়ে বসে থাকতাম—তুমি কখন আসবে,আসলে তোমাকে আমি চোখের এক কোণ দিয়ে দেখতাম তো,যাতে কেউ বুঝতে না পারে আমি তোমাকে দেখছি।'

ত্রিধা একটু মুচকি হেসে বললো,'বুঝলাম।'

আমি আবার বললাম,'কিন্তু আমি আসলে ঠিক করে বলতে পারবো না কেন তোমাকে ভালো লাগে!'

ত্রিধা কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর বললো,'সন্ধ্যা হয়ে গেছে বাসায় ফিরতে হবে।'

মৌমিতা এতক্ষণ আমাদের কথা শুনছিল। ও বললো,'হ্যাঁ, চল দিভাই সন্ধ্যা হয়ে গেছে।'

'মৌমিতা বাড়িতে যদি বলে কোথায় ছিলে, কি বলবি?'ত্রিধা মৌমিতাকে জিজ্ঞেস করলো।

'কি বলবো?'

'বলবি পুকুরঘাটে বসে ছিলাম।'

'ঠিক আছে দিভাই।'

আমি আর কিছু বললাম না। 


পরেরদিনও ত্রিধা আসলো,কিন্তু সেদিন তার সাথে মৌমিতা ছিল না।ত্রিধা একা আসলো।

আমিও জানলার কাছে বসে থাকতাম,যখন ত্রিধা আসবে,আমিও ঘর থেকে বেরিয়ে যাব।


সেদিনও ত্রিধাকে দেখে বের হয়েছিলাম।ত্রিধা আমাকে বললো,'চলো নদীর পাড়ে যাই,খুব ভালো লাগে ওখানে।'

'আপনি যাবেন আজকেও?'

'হ্যাঁ,তুমি বলে ডাকতে পারো।'

'ঠিক আছে, আজ মৌমিতা এলো না কেন?'

' ওর টিউশন আছে।'

'ও' ছাড়া কিছু বললাম না। 

'যাবে?'

'চলো।'

ত্রিধা প্রতিদিনই আসতো।কোনদিন মৌমিতা আসতো আবার কোনদিন আসতো না।

একদিন নদীর পাড়ে বসে ত্রিধা হঠাৎ করে আমাকে বলতে লাগলো,'আসলে তোমাকেও আমার খুব ভালো লাগে, প্রথমবার যখন পুজোতে তোমাকে দেখেছি তখন থেকেই। আমিও কিন্তু  তোমাকে চোখের এক কোণ দিয়েই দেখতাম—যেভাবে তুমি আমাকে দেখতে!তাই হয়ত তুমিও লক্ষ্য করো নি।'

ত্রিধার কথা শোনে,আমি সেদিন যে কি খুশি হয়েছিলাম বলে বোঝাতে পারবো না। 

আমি যে ভার্সিটিতে পড়ি,ত্রিধাও সেই ভার্সিটিতে চান্স পেয়েছে। ও এখন ওর মামার বাড়িতে থেকেই পড়বে।—এর থেকে আমার জন্য আর খুশির খবর কি হতে পারে?

 আমার লাস্ট ইয়ার,ওর ছিল ফার্স্ট ইয়ার।

 

 

ত্রিধা আমায় বললো, ‘আমরা আমাদের পরিবারকে জানিয়ে দেব।' 

আমি ত্রিধার কথায় রাজি হয়েছিলাম।

আমরা ভেবেছিলাম হয়ত আমাদের পরিবার মানবে না,আমাদের খুব ভয় হচ্ছিল। কিন্তু এমন কিছুই হলো না। আমাদের দুজনের পরিবারই মেনে নিয়েছিল।

ত্রিধার পড়ালেখা  শেষ হলে আমাদের বিয়ের কথা পাকাপাকি করা হবে।


ত্রিধা এবার লাস্ট ইয়ারের ফাইনাল দেবে।

আমাদের বিয়ের কথা ঠিক হয়ে গেলো। আমরা খুব খুশি ছিলাম।কিন্তু এই খুশি বেশিদিন থাকলো না!


কয়েকদিন ধরেই ত্রিধার খুব কাশি হচ্ছে। ওকে ডাক্তার দেখাতে বললাম। ও বললো দেখিয়েছে। 

অতিরিক্ত কাশি হচ্ছিল।একদিন ও ওর স্কার্ফ দিয়ে মুখ ঢেকে কাশতে লাগলো।ওর স্কার্ফ সরাতেই দেখলাম স্কার্ফে রক্ত লেগে আছে! ও আমাকে দেখাতে চায়ছিল না, আমি একরকম  জোর করেই দেখলাম।তখন ও বললো,এ কিছু না,অষুধ খাচ্ছে কমে যাবে।আমিও তাই মনে করেছিলাম।

 

 

কিন্তু ইদানীং ওর অতিরিক্ত কাশি হচ্ছে, কাশের সাথে রক্তও যাচ্ছে। তখন আমি ওকে জোর করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই।

ডাক্তার ত্রিধাকে কিছু টেস্ট করালো।

যেদিন ত্রিধার টেস্টের রিপোর্ট দেখেছিলাম,সেদিন থেকে আমাদের জীবনটা বদলে গেলো।


ত্রিধার লাঙ্স ক্যান্সার হয়েছে। আর সেটা খুবই গাঢ় হয়ে গেছে। আমি ত্রিধাকে কিছু জানালাম না, বাড়ির কাউকেও কিছু জানালাম না।—জানালে সবাই ভেঙে পড়বে।

ডাক্তার বললো,ত্রিধাকে কিছু থেরাপি দেবেন—তারপর যদি একটু কোনো পরিবর্তনও না হয়,তাহলে তাকে অস্ট্রেলিয়া নিয়ে যেতে হবে। 

ত্রিধাকে না বললেও ত্রিধা বুঝে গেছিল ওর আসলে কী হয়েছিল। 

থেরাপির জন্যে ত্রিধার চুল পড়ে গেছিল।কিন্তু বেশি কোনো পরিবর্তন হলো না। তাই আমি ঠিক করলাম ত্রিধাকে অস্ট্রেলিয়া নিয়ে যাবো।

আমাদের আশীর্বাদ হয়ে গেছিল। তাই আমি ভেবেছিলাম আমাদের বিয়ের পরেই ত্রিধাকে অস্ট্রেলিয়া নিয়ে যাবো। বিয়ের মাত্র আর এক সপ্তাহ ছিল। 


একদিন ত্রিধা নদীর পাড়ে বসে আমাকে জিজ্ঞেস করলো,'তুমি কি এখনও  এই চুলপড়া কুৎসিত মেয়েকে বিয়ে করবে?'

আমি তখন আর চোখের জল আটকাতে পারলাম না। চোখের জল মুছে আমি ত্রিধাকে বললাম,'কে বললো তুমি চুলপড়া কুৎসিত মেয়ে?তোমাকে এখনও আগের মতো সুন্দর লাগে,আর কখনো এমন কথা বলবে না তুমি।ঠিক আছে?'

ও কিছু বললো না।আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলো।তারপর আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল। আমি আর ওকে বারণ করিনি কাঁদতে। ভেবেছিলাম, কাঁদলে ওর মনটা একটু হলেও হালকা হবে।

 আমরা তখনও নদীর পাড়ে গিয়ে বসতাম,যেদিন ত্রিধার শরীরটা একটু ভালো থাকতো।কিন্তু সবদিন যেতে পারতাম না। 


ত্রিধা আমাকে বলতো,'তুমি আমাকে বিয়ে করো না,আমি হয়ত আর বাঁচবো না।'

আমি শুধু ওকে বলতাম,'একথা বলো না,তুমি সুস্থ হয়ে যাবে,আমাদের বিয়ের পরই তো আমি তোমাকে অস্ট্রেলিয়া নিয়ে যাবো।'


আমাদের বিয়ের আর দুদিন বাকি।বুধবারে লগ্ন ঠিক করা হয়েছে সন্ধ্যা ৭:০০টা থেকে ৮:১৫ পর্যন্ত। ত্রিধা বেশি রাত জাগতে পারবে না বলে গোধূলি লগ্ন ঠিক করা হয়েছে। 

সোমবার রাতে ত্রিধা খুব অদ্ভুত আচরণ করছিল। ওর নাকি খুব কষ্ট হচ্ছিল। মৌমিতা আমাকে রাতে ফোন করে বলতেই আমি মা-বাবাকে নিয়ে মৌমিতাদের বাড়িতে গেলাম। 

আমাকে দেখতেই ত্রিধার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে গাল বেয়ে পড়ছিল।

আমার চোখ দিয়েও আমার অজান্তেই জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো।

ঘরটাতে নিস্তব্ধ ছিল,সবাই খুব গম্ভীর হয়ে বসে ছিল। আমি ত্রিধার কাছে গিয়ে বসে ওর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললাম,'তুমি ঠিক হয়ে যাবে ত্রিধা,তোমার কিচ্ছু হবেনা।' মনে মনে মা দূর্গাকে ডাকছিলাম,"মা তুমি ত্রিধাকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যেও না।"

কিন্তু মা দূর্গা আমার কথা শুনলেন না।

ত্রিধা এখন আর কাঁদছে না।ত্রিধার চোখের শেষ অশ্রুবিন্দুটি ওর গাল বেয়ে আমার হাতের ওপরে পড়লো।

এখন আর কোনো কষ্ট হচ্ছে না ওর।ত্রিধা আর কিছু বলবে না কখনো। 

আমি ত্রিধার চোখে হাত বুলিয়ে দিলাম। আমার ইচ্ছে করছিল চিৎকার করে কাঁদতে। আমার চোখ দিয়ে তখন অশ্রুধারা বয়ে যাচ্ছিল। 

সেই নিস্তব্ধ ঘরটাতে কান্নার রোল পড়ে গেল।আমি স্তব্ধ হয়ে ওর পাশে বসে,ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলাম। ত্রিধা যেন সেই রাতে আগের চেয়ে আরো বেশি সুন্দর হয়ে গেছিল!ওর চেহারার উজ্জ্বলতা যেন আরো বেড়েছিল।আরো আলোকিত লাগছিল ওর চেহারা!


সেই রাতটাতে ত্রিধার খুব কষ্ট হচ্ছিল। সেই দৃশ্যটা এখনও মনে ভেসে উঠলে — আমার চোখ দিয়ে আমার অজান্তেই জল গড়িয়ে পড়ে।

 

আমি এখনও এই নদীর পাড়ে এসে বসি।কিন্তু এখন আমি একা এসে বসে থাকি।আমার সাথে এখন আর ত্রিধা বসে নেই। 

আমি নদীর পাড়ে বসে ত্রিধার সাথে বসে যে গল্প করতাম,সেগুলোই কল্পনা করি।আমার মনে চায়,চিৎকার করে ত্রিধাকে ঈশ্বরের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে আসি।

ঈশ্বর কেন ত্রিধাকে এই কঠিন রোগ দিয়ে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিলো?


হয়তো আমি ত্রিধাকে বাঁচাতে পারতাম।যদি বিয়ের আগেই ওকে অস্ট্রেলিয়া নিয়ে যেতাম।নিজেকে খুব দায়ী মনে হয়। 

 

নদীর পাড়ে বসে থাকতে থাকতে আমার মনে পড়ে যায়—ত্রিধা যখন আমার দিকে তাকিয়ে হাসি দিতো,গল্প করতো,এই কথা-সেই কথা বলতো।তখন মনে হয় এই নদীতেই ঝাঁপ দেই।


যখন সন্ধ্যা নামে—অন্ধকারে যখন তারাগুলো আলোকিত হয়ে দৃশ্যমান হয়,আমার মনে হয় ত্রিধা বুঝি আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে,আমার সাথে গল্প করছে। 

এই কথাগুলো ভেবে আমার চোখের কোণে জল জমে।

এই চোখের কোণ দিয়েই আমি ত্রিধাকে প্রথম প্রথম দেখতাম।

 


Sandeep Roy
Nipendra Biswas
Champa Sen Pinky
তারা এই গল্পটি পছন্দ করেছেন ।

৩টি মন্তব্য

Nipendra Biswas

Nipendra Biswas

৩ বছর আগে

অসাধারণ🙂

Sandeep Roy

Sandeep Roy

৩ বছর আগে

মনোমুগ্ধকর

Champa Sen Pinky

Champa Sen Pinky

৩ বছর আগে

সত্যিকারের ভালোবাসা কখনো ভুলা যায় না,এই গল্পটি তারই প্রমাণ।অসাধারণ একটি প্রেমের গল্প ❣️


মন্তব্য লেখার জন্য আপনাকে অবশ্যই লগ ইন করতে হবে


আপনার জন্য

প্রিয় মা

প্রিয় মা

  প্রিয় মা,কেমন আছো তুমি...

হাস্যকর এক কাণ্ড

হাস্যকর এক কাণ্ড

কয়েকদিন আগের কথা। আমি যে...

নাম হীন গল্প - শেষের অংশ

নাম হীন গল্প - শেষের অংশ

প্রথম অংশের পর…     তখন ...

যখন সন্ধ্যা নামে

যখন সন্ধ্যা নামে

প্রতিদিন যখন সন্ধ্যা নাম...

আমি (পর্ব৭)

আমি (পর্ব৭)

খোলা আকাশের নিচে এসব কথা...

কে ছিল???

কে ছিল???

আমি আগে ৯ -১০ টার মধ্যেই...

পরীক্ষার পূর্বদিন

পরীক্ষার পূর্বদিন

সারাবছর ভালো করে পড়েনি প...

পাহাড়ের চূড়া

পাহাড়ের চূড়া

             পাহাড়ের চূড়...

উধাও ||  পর্ব - ২

উধাও || পর্ব - ২

পর্ব একের পর … রামিম একজ...

ছোট দাদুর বাড়িতে কয়েকদিন.....(পর্ব ১)

ছোট দাদুর বাড়িতে কয়েকদিন.....(পর্ব ১)

ছোট দাদুর  বাড়িতে কয়েকদি...

নীল দ্বীপ (পর্ব২)

নীল দ্বীপ (পর্ব২)

ব্রেকফাস্ট শেষে মৃন্ময় ত...

আমরা তো সবাই মানুষ!!!!

আমরা তো সবাই মানুষ!!!!

তখন আমি ক্লাস 5 এ পড়ি, স...

Birthday যখন Foolday!!🎶

Birthday যখন Foolday!!🎶

 Birthday  যখন Foolday🎶...

মিঠু

মিঠু

  আমি মিঠু। পুরো নাম মিঠ...

~পিল্টু

~পিল্টু

রেলস্টেশনটার পিছনের দিকে...

পড়ন্ত বিকেলে...

পড়ন্ত বিকেলে...

পড়ন্ত বিকেলে...সারাদিন ঝ...

সুবিমলবাবুর স্মরণীয় বাস জার্নি

সুবিমলবাবুর স্মরণীয় বাস জার্নি

১.সুবিমলবাবু অনেকদিন পর ...

উধাও  || পর্ব -১

উধাও || পর্ব -১

৬৬ সালের মে মাস…. প্রমাণ...

দৃষ্টিগোচর

দৃষ্টিগোচর

জীবনে অসফল এক ব্যাক্তি আ...

কে তুমি  (শেষ পর্ব )

কে তুমি (শেষ পর্ব )

                   কে তু...