কেমন আছো তুমি


কেমন আছো তুমি


 

নিলিকে আমি আমার মনের কথাটা বলতে পারি নি। খুব ভালোবেসে ফেলেছিলাম ওকে—কিন্তু কখনো ওকে বলাই হয়নি!আসলে বলতে পারিনি—বন্ধুত্ব ভেঙে যাওয়ার ভয়ে।খুব ভালো বন্ধু ছিলাম আমরা।


 

অনেকদিন ধরে ওর সাথে দেখা হয় না। আর কয়েক মিনিটের মধ্যে ওর সাথে দেখা হতে চলেছে।নিলি কলকাতায় কি একটা জব করে—ওখানেই থাকে।

অনেকদিন ধরে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয় না—তাই আমাদের সঙ্গে এখানে দেখা করতে আসছে।আমরা সব বন্ধুরা—আদি,রিজু,মিম আর আমি এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে আছি। রঞ্জু আসতে পারে নি।কিন্তু পরে  ওর সাথে দেখা হবে।


 

অনেকদিন পরে নিলির সাথে সরাসরি দেখা হবে আমার-কথা হবে।আমি কিভাবে যে,নিলির সাথে কথা বলবো—বুঝতে পারছি না। আমার বুকটা কাঁপছে!আমি একটু বন্ধুদের থেকে দূরে সরে গিয়ে দাঁড়ালাম—নারভাসনেস কাটানোর জন্যে।


 

আজ প্রায় ৮বছর পর আমার নিলির সাথে দেখা হবে। এই ৮বছরে অনেককিছুই পালটে গেছে। 

আমি দাঁড়িয়ে আছি—নিলির গলার স্বর শুনতে পেলাম পিছন থেকে,"কেমন আছিস তোরা?"স্বরটা একটু চেঞ্জ হয়েছে। 

অমনি পিছন থেকে নিলি আমাকে ডাক দিলো,"হাউ আর ইউ?....মিস্টার নীল!"

আমি পেছনে মুখ ঘুরালাম।আমি মুখ পিছনে ফিরিয়ে ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম। ওর মুখশ্রীটা আগের থেকে আরও অনেক সুন্দর হয়েছে—যেন দেবী!

তারপর একটা হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,"কেমন আছো তুমি….নিলি?"

"তুমি?...তুমি?...আমরা আগে একে অপরকে তুই করে ডাকতাম না?" নিলি একটু অবাক হলো।

"ও...হ্যা.."

"তাহলে?"

"কেমন আছিস তুই….নিলি?"-আমি ভুলটা শুধরে নিলাম।

" এবার ঠিক আছে।"নিলি ছোট্ট একটা হাসি দিয়ে বললো,"অনেক ভালো আছি।তোদেরকে দেখে আরো অনেক ভালো হয়ে গেলাম।"


 

আমরা সব বন্ধুরা মিলে নিলিকে নিয়ে গিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে বসে বেশ খানিকক্ষণ গল্পগুজব করলাম।তখন আমি গল্পগুজব থেকেও বেশি মনোযোগ দিচ্ছিলাম নিলির দিকে!

নিলিকে হয়তো এবার আমার মনের কথাটা বলতে পারবো।

রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে তারপর নিলিকে ওর হোটেলে ছেড়ে দিয়ে এলাম।সন্ধ্যেবেলায় আমরা সবাই আড্ডা দিবো-ঘুরবো ফিরবো,ততক্ষণ নিলি একটু রেস্ট নিয়ে নেবে—অনেকদিন পরে আমরা সব বন্ধুরা এমন একটা সময় কাটাবো।

নিলিকে বলেছিলাম,আমাদের কারো বাসায় থেকে যেতে।ও বললো,ও কাউকে বিরক্ত করতে চায় না।


 

অনেকদিন পরে নিলিকে দেখে আমার কি যে ভালো লাগছিল!

"নিলি,অনেক ভালোবেসে ফেলেছিলাম তোকে,কিন্তু বলতে পারি নি!"


 

সন্ধ্যেবেলায় আমরা সবাই মিলে আড্ডা দিবো বলে নিলিকে ওর হোটেল থেকে ড্রপ করে নিলাম। 

অনেক হাঁটাহাঁটি করলাম।পার্কে বসে অনেক ফাস্টফুড খেলাম—তার সাথে গল্পগুজব তো আছেই!

আমি অনেক দিন পরে এমন একটা সময় কাটালাম বন্ধুদের সাথে। আর বিশেষ করে নিলির সাথে। 

তারপর ডিনারও করলাম বাইরেই।


 

নিলির কারণে এমন একটা সময় কাটাচ্ছি অনেকদিন পর—

একদিন হঠাৎ নিলির ফোন আসলো আমার কাছে—ও নাকি কলকাতা থেকে এখানে আসছে,আমাদের সাথে দুদিন কাটানোর জন্যে।সব বন্ধুদের সাথে দেখা করার জন্যে। 

তখন আমি অনেক কষ্ট করে সব বন্ধুদের নাম্বার যোগাড় করলাম। ওদেরকে একসঙ্গে করলাম। আসলে সবাই সবার কাজে ব্যস্ত, কারও সময় হয় না নাম্বার-টাম্বার খুঁজে কথা বলা।তেমন একটা যোগাযোগ বন্ধুদের সঙ্গে ছিলো না।

কিন্তু নিলি আমার নাম্বার পেলো কোত্থেকে কে-জানে?


 

পরদিন সকালে আমরা সবাই মিলে আবার বেড়িয়ে পড়লাম।প্রথমেই গেলাম স্কুলটাতে যেখানে আমরা একসাথে পড়তাম।আর যেখানে নিলির সাথে আমার প্রথম দেখা হয়।

"নিলি...তোর মনে আছে, তুই বারান্দায় ভিজে দাঁড়িয়ে ছিলি আর আমি তোকে জিজ্ঞেস করেছিলাম," অ্যাডমিট কার্ড ভিজে গেছে নাকি?"নিলিকে জিজ্ঞেস করলাম। 

"হ্যা,মনে আছে।"

"সেদিন আমাদের মাধ্যমিকের শেষ পরীক্ষা ছিল।"

"হুম,সেদিনই তোর সাথে আমার প্রথম দেখা এবং কথা হয়।"

"হ্যা।"

“ আমি এর আগে ভাবতাম তুই  অহংকারী।” নিলি একটা হাসি দিলো।

"অহংকারী?"

“মানে,তুই কারও সঙ্গে বেশি কথা বলতি না—আমি মনে করতাম তুই একটু ব্রিলিয়ান্ট তাই হয়তো তোর ভিতরে অহংকার আছে।”

"সেরকম কিছুই না। "

"আমি জানি,নীল।" 


 

আমরা স্কুলটা ঘুরে দেখলাম।আরো অনেককিছুই দেখানোর আছে নিলিকে আর অনেককিছু বলারও।

যদি আজ বলতে না পারি তাহলে হয়তো কখনোই আর বলা হবে না!

আজ সন্ধ্যে ৭টায় নিলির ফ্লাইট। আজ নিলি চলে গেলে তাহলে আমরা আবার আমাদের কাজে চলে যাবো—ব্যস্ত হয়ে পড়বো।আবার কখন দেখা হবে বলতে পারি না !


 

আমরা বন্ধুরা অনেকসময় একসঙ্গে কাটালাম।ঘুরলাম-ফিরলাম,খেলাম,গল্প করলাম,গান করলাম,আড্ডা দিলাম।

কিন্তু নিলিকে এখনো 'না বলা কথাটা' বলতে পারি নি।

আর যদি আজ বলতে না পারি কখনোই বলা হবে না।আমার ভালোবাসা অনেক গভীরে হারিয়ে যাবে! 

আমি নিলিকে ডাক দিয়ে বন্ধুদের থেকে একটু দূরে নিয়ে এলাম।

"নিলি,আমার কবিতাটা তোর মনে আছে?"আমি জিজ্ঞেস করলাম। 

"কোন কবিতা?"

" যখন প্রথমবার দেখেছিলাম তোমায়..

কতগুলো অনুভূতি জমেছে…… "পুরোটা শেষ করতে পারলাম না। 

" হ্যা-হ্যা,মনে আছে।ওটা বেস্ট ছিল।"

" কার জন্য লিখেছিলাম জানিস?"

"কার জন্য?" নিলি ভ্রু কুঁচকালো।

আমি বলতে চাচ্ছিলাম কিন্তু পারছিলাম না। অবশেষে বলে ফেললাম,"তোর জন্য নিলি!"

নিলির মুখটা হঠাৎ করে ফ্যাকাশে হয়ে গেলো।ও কিছু বললো না।

আমিই খানিকক্ষণ পরে আবার বললাম,"আসলে নিলি,আমি তোকে খুব ভালোবেসে ফেলেছিলাম কিন্তু বলতে পারি নি…. "এবারও নিলি আমাকে পুরো কথাটা বলতে দেয় নি।

ও বলতে লাগলো," অনেক দেরি হয়ে গেছে নীল!আগে যদি বলে দিতি,আমি তোকে ঠিকই মেনে নিতাম।তোর চেয়ে ভালো বন্ধু আমি আর কোথাও পেতাম না।"নিলি একটু থামলো,তারপর বললো,"আমার বর মারা গেছে দুবছর হয়ে যাচ্ছে। "

আমি কথাটা শুনে থমকে গেছিলাম!

"নিলি,তুই আমাদেরকে কিছু বলিসনি তো?" আমি জিজ্ঞেস করলাম। 

"নীল,আমি এখানে আনন্দ করতে এসেছি। ওই কষ্ট টা ভুলাতে চেয়েছি।তোদের কাউকে আপসেট করতে আসি নি!"

" সরি নিলি,ভেরি সরি!"

" প্লিয,একথাটা কাউকে বলিস না।"

একথা বলে নিলি চোখ মুছতে মুছতে চলে গেলো।

আমি কথাটা বলে ঠিক করলাম না।মেয়েটা এখানে কষ্ট ভুলাতে এসেছিল।আমি আবার কষ্টটা মনে করিয়ে দিলাম?


 

এয়ারপোর্টে নিলিকে ছাড়তে আমরা সবাই এলাম।যাওয়ার সময় নিলি আমাকে বললো, "নীল,আমরা সবসময়ই বেস্ট ফ্রেন্ড থাকবো।"

"অবশ্যই থাকবো,নিলি।"

নিলি হেঁটে চলে গেলো।আমি ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম।আমার চোখ ভিজে এলো!

নিলিও আর পিছন ফিরে তাকায়নি।হয়তো ওরও চোখ ভিজে গেছিলো!



 


Nipendra Biswas
Sandeep Roy
তারা এই গল্পটি পছন্দ করেছেন ।

১টি মন্তব্য

Nipendra Biswas

Nipendra Biswas

২ বছর আগে

আপনার গল্পগুলো এত ইমোশনাল কেন হয়? ভালো লাগলো পড়ে😀 কিন্তু লাস্টে মন খারাপ হয়ে গেলো😔😱😭


মন্তব্য লেখার জন্য আপনাকে অবশ্যই লগ ইন করতে হবে


আপনার জন্য

লায়লা

লায়লা

"তুমি ছুয়ে দিলে হায়, কিয...

কবরস্থানের মাঠে একরাত

কবরস্থানের মাঠে একরাত

কবরস্থানের মাঠে একরাত লে...

ধাপ্পাবাজ বাপ্পা অথবা ধাপ্পাদা

ধাপ্পাবাজ বাপ্পা অথবা ধাপ্পাদা

—বাপ্পাদার নাম যেভাবে ধা...

সেদিন

সেদিন

 আজ সকাল থেকেই আকাশটা কে...

রিক্সাচালক

রিক্সাচালক

প্রখর রোদে দাড়িয়ে আছে আয়...

পাহাড়ের চূড়া

পাহাড়ের চূড়া

             পাহাড়ের চূড়...

অপেক্ষা

অপেক্ষা

অপেক্ষা, এই জিনিসটা খুব ...

শেষ

শেষ

      ফোন রিং হওয়ার শব্দ...

আমরা তো সবাই মানুষ!!!!

আমরা তো সবাই মানুষ!!!!

তখন আমি ক্লাস 5 এ পড়ি, স...

আসক্ত

আসক্ত

১. আমি ভিডিওগেম আসক্ত। এ...

নীল দ্বীপ  ( পর্ব ৪)

নীল দ্বীপ ( পর্ব ৪)

মৃন্ময় বাসায় এলো।রুমে ঢু...

ভয়

ভয়

ছোট বেলার থেকেই আমি ছিলা...

ভয়ের রাত

ভয়ের রাত

ভয়ের রাত চিন্টুর শরীরটা ...

তুমি অনন্যা (পর্ব ৪)

তুমি অনন্যা (পর্ব ৪)

ইসরাত কাছে এসে বললো,"আচ্...

আমি (পর্ব৩)

আমি (পর্ব৩)

"এমনি দিসিলাম।কি করছিলি ...

করোনা

করোনা

নাম ছিলো তার করোনা। খুব ...

প্রিয় জয়ন্ত স্যার

প্রিয় জয়ন্ত স্যার

তখন সবে হাইস্কুলে উঠেছি।...

খাঁটি পাগল

খাঁটি পাগল

বিধূবাবুর কাছে এক পাগল এ...

নীল দ্বীপ (পর্ব ৬)

নীল দ্বীপ (পর্ব ৬)

পরদিন সকালে শুভ্র আর মৃন...

তুমি অনন্যা  (পর্ব ৬)

তুমি অনন্যা (পর্ব ৬)

রনির মন চাচ্ছে আবার দেখা...